ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: চ্যালেঞ্জের মুখে নির্মাণকাজ

0
HASNAT NAYEM; DP-234

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের অনেক জায়গায় পিলারও দাঁড়িয়ে গেছে। তবে, বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ সালের ১২ নভেম্বরে এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয়। বর্তমানে ২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এক্সপ্রেসওয়েটির নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। মোট এক হাজার ৯৬০টি পিলারের মধ্যে এক হাজার ২০০টি পিলার দাঁড়িয়ে গেছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদকাল থাকলেও এর সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ। আছে মাত্র ১৬ মাস। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে জনগণের জন্য তা উন্মুক্ত করতে বেশ বেগ পেতে হবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের।

তারা বলছেন, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- ইউটিলিটি রিলোকেশন, বিমানবন্দর এলাকায় কাজ করার জন্য সাইট না পাওয়া এবং প্রকল্পের ডিজাইন পরিবর্তন।

ইউটিলিটি রিলোকেশন

আশুলিয়া বাজার থেকে সাভার ইপিজেড পর্যন্ত বিদ্যুতের লাইন সরাতে হবে, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে আপাতত ওই অংশে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ এলাকার বিদ্যুতের লাইন মাটির নিচ দিয়ে নিতে হবে। এতে প্রয়োজন হবে বাড়তি খরচ। যা প্রকল্পে আগে থেকে ধরা ছিল না।

বিমানবন্দর এলাকায় কাজ করার জন্য সাইট না পাওয়া

বিমানবন্দরের কাওলা থেকে পিলার তুলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জমি পড়েছে এ অংশে। তারা জমি হস্তান্তর করছে না সেতু কর্তৃপক্ষকে। ফলে এ অংশের ৮৫০ মিটারের মধ্যে ৬৫০ মিটারে কোনো কাজ হচ্ছে না।

ডিজাইন পরিবর্তন

ধউর থেকে আশুলিয়া নদীর শ্রেণি পরিবর্তন হয়েছে। ফলে ব্রিজের উচ্চতা বেড়েছে। এ ছাড়া বাইপাইল মোড়ে ওঠা-নামার জায়গা ছিল না। সেখানে ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ করা হবে নতুন করে। ফলে ডিজাইনেও পরিবর্তন আনা হবে। এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয় আগের চেয়েও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, প্রকল্পটি শিল্পাঞ্চল এলাকায় হওয়ায় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তারপরও প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করে বলছেন, সবধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রকল্পের কাজ প্রতিনিয়ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এটির কাজ শেষ করা যাবে।

সরেজমিনে যা দেখা গেল

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তিনটি ধাপে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ চলছে। এটির প্রথম সেকশন শুরু হয়েছে বিমানবন্দরের কাওলা থেকে, দ্বিতীয় সেকশন ধউর ব্রিজ থেকে এবং তৃতীয় সেকশন আশুলিয়া থেকে। বর্তমানে প্রকল্পটির অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে পাইল, ব্রড পাইল, পাইল ক্যাপ, পিয়ার ও পিয়ার ক্যাপ নির্মাণের কাজ চলছে। অনেক জায়গায় পিলারও দাঁড়িয়ে গেছে।

আরও দেখা গেছে, এ প্রকল্পে মোট এক হাজার ৯৬০টি পিলার নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে এক হাজার ২০০টি পিলার দাঁড়িয়ে গেছে। বাকিগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ চলছে। মোট গার্ডার আছে নয় হাজার ১৩৮টি। এর মধ্যে এক হাজার ৯৬৮টি বসে গেছে। চলছে জমি অধিগ্রহণও। প্রকল্পের কাজের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৩৭ ভাগ এবং সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৫০ ভাগ।

তবে, সেকশন ১ ও ২ থেকে সেকশন ৩-এর কাজ কিছুটা পিছিয়ে আছে। ড্রেনেজ লাইনের কাজও খুব একটা এগোয়নি।

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম সম্প্রতি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রকল্প চলাকালে সমস্যা আসবেই। সেগুলো অ্যাড্রেস করেই আমরা কাজ করছি। আশুলিয়া বাজার এলাকায় বিদ্যুতের লাইন সরানো নিয়ে সমস্যা ছিল। সেখানে পল্লী বিদ্যুতের লোকজন কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যদিও এটির জন্য আগে কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না। আমরা সেটি জোগাড়ের চেষ্টা করছি। আমরা তাদেরকে বলেছি, আপনারা কাজ করতে থাকেন। আমরা সময় মতো আপনাদের অর্থ পরিশোধ করব। যেহেতু দুটিই সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রত্যাশা করছি অর্থ পরিশোধে কোনো সমস্যা হবে না।’

বিমানবন্দর এলাকায় কাজ করতে না পারা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই বিমানবন্দর এলাকার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করতে পারব।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞের মতামত

প্রকল্পটি প্রসঙ্গে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি যখন কুতুবখালী থেকে বিমানবন্দর হয়ে বাইপাইল পর্যন্ত যাবে, তখন এটি ট্রান্সফরমেশন অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে। তখন ঢাকার মধ্যে প্রবেশ না করে ভারী যানবাহনগুলো ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা ক্রস করতে পারবে।

‘যখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যানবাহনগুলো ঢাকাকে ভার্টিক্যালি বাইপাস করবে, তখন নিচের রাস্তাগুলো অনেকটা চাপমুক্ত হবে। ফলে গণপরিবহনের জন্য প্রসারিত ও যানজটমুক্ত একটি সড়ক আমরা পাব। তবে, এটির জন্য আমাদের ২০২৬-২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

রাজধানী ঢাকা শহরের যানজট কমাতে এবং ব্যস্ত এই মহানগরীকে এড়িয়ে নির্বিঘ্নে গাড়ির চলাচল নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের আবদুল্লাহপুর, আশুলিয়া, বাইপাইল এবং ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ডিইপিজেড) সঙ্গে সংযুক্ত করবে। বিমানবন্দরের কাছে এটি ঢাকার প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে মিলিত হবে। উড়াল সড়কটি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট হারে টোল দিতে হবে প্রতিটি যানবাহনকে।

প্রকল্পের বিবরণ

প্রকল্পের আওতায় মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থাকবে ২৪ কিলোমিটার। যেটি বিমানবন্দর, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো, বাইপাইল ও ঢাকার ইপিজেডে গিয়ে শেষ হবে। এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠা-নামার জন্য ১০.৮৪ কিলোমিটারের ১৪টি র‍্যাম্প থাকবে। এ ছাড়া নবীনগর ফ্লাইওভার হবে ১.৯৫ কিলোমিটার। আশুলিয়া বিলের ওপর চার লেনের ২.৭২ কিলোমিটারের সেতু থাকবে। থাকবে ১৪.২৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চার লেনের রাস্তা।

এক্সপ্রেসওয়ের উভয় পাশে ১৮ কিলোমিটার ড্রেনেজ, ৫০০ মিটার ওভারপাস, বাইপাইল ইন্টারচেঞ্জ, পাঁচটি টোলপ্লাজা নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ৩৬.০৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা।

২০১৭ সালে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন করা হয়। ওই সময় নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২২ সালের জুন মাসে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু তখন কোনো কাজই শুরু হয়নি। পরে আরও চার বছর অতিরিক্ত সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এর মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়। ২০২২ সালের ১২ নভেম্বরে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি চার লাখ টাকা। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণ হিসেবে দিচ্ছে নয় হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। বাকি সাত হাজার ৮৬০ কোটি দেবে বাংলাদেশ সরকার।

ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি)।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ঢাকা পোস্টে’ প্রকাশিত আরও ছবিসহ মূল প্রতিবেদনটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *